Friday, January 10, 2020

পাহাড়ের কোলে এক দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধ

Jugantor

সম্পাদকীয়
পাহাড়ের পাদদেশে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাঁশতলা-হকনগর শহীদ স্মৃতিসৌধ। এটি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের সীমান্তের একেবারে জিরো পয়েন্টে অবস্থিত।
এমনিতেই এ জায়গাটি একটি পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানকার পাহাড়ি মনোরম দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের মন কেড়ে নেয়। অধিকন্তু ভারতীয় সীমানার কোল ঘেঁষে বাংলাদেশের জুমগাঁও গারো পাহাড়ের অবস্থান। এটি অন্তত ২০০ বছরের পুরনো আদিবাসী অধ্যুষিত ছোট এক গ্রাম। প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অবলোকন করতে প্রতিদিন হাজারও মানুষ এখানে এসে জড়ো হন। জুুমগাঁও গ্রামে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের প্রায় ২৫টি পরিবারের বসবাস।
এখানকার চারদিকে সবুজের সমারোহ। পড়ন্ত বিকেলে পাখির কলরব এবং বাতাসের মনমাতানো শব্দে প্রাণ জুড়ায়। ছোট ছোট টিলা আর পাহাড়ে সাজানো বিস্তীর্ণ এলাকা যেন মন ছুঁয়ে যায়।
ভারত সীমান্তে পাহাড়ি ঝরনা চোখে পড়ার মতো। হকনগরস্থ মৌলা নদীর ওপর স্লুইসগেটটি বিমোহিত করার মতো একটি জলপ্রবাহ। এখানে ঠাণ্ডা ও শীতল স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটলে সহজেই শরীরের ক্লান্তি দূর হবে। স্লুইসগেট ছাড়িয়ে একটু সামনে গেলেই দেখা মিলবে পাহাড় ঘেঁষা কিছুটা ত্রিভুজাকৃতির স্মৃতিসৌধ। এখনাকার আশপাশের পরিবেশ খুবই শান্ত ও মনোরম।
সবুজ পাহাড় আর নীল আকাশের মিতালি দেখে মনে হবে যেন আকাশে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে পাহাড়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ পাহাড়ের সমতলে নান্দনিক এই স্মৃতিসৌধ।
মুক্তিযুদ্ধকালীন এলাকাটি ছিল ৫নং সেক্টরের চেলা (বাঁশতলা) সাব-সেক্টরের সদর দফতর। এ সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন এএস হেলাল উদ্দিন। পরবর্তী সময়ে এখানে ছিলেন লে. আবদুর রউফ, লে. মাহবুব। যুদ্ধ পরিচালনায় তাদের সহযোগিতা করেন এমএনএ আবদুল হক, শহিদ চৌধুরীসহ আরও অনেকে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাঁশতলা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় যারা শহীদ হয়েছেন, এখানেই তাদের সমাহিত করা হয়। স্বাধীনতার পর সামছু মিয়া চৌধুরী এমপির উদ্যোগে এখানকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর পাকা করা হয়।

Thursday, January 2, 2020

এক ঘণ্টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম!

তুহিন শুভ্র অধিকারী
রেলপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে কতো সময় লাগে? এমন প্রশ্নের জবাবে যে কেউ বলবে, প্রায় ছয় ঘণ্টা। আবার কোনো কারণে দেরি হলে কয়েক ঘণ্টা বেশিও লাগতে পারে।
যদি এক ঘণ্টার একটু বেশি সময়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়া যায়, তাহলে কেমন হয়?
হয়তো শুনতে অবাক লাগছে? তবে হ্যাঁ, বুলেট ট্রেন বা উচ্চ গতির রেল সেবা চালু হলে এমন ঘটনাই ঘটবে। আর বাংলাদেশ প্রবেশ করতে যাচ্ছে সেই যুগে।
দ্রুত-গতির রেল যাত্রী সেবা শুরু করলে রাজধানী থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে যাওয়ার সময় কমে ৭৩ মিনিটে দাঁড়াবে। যদি সেটি বিরতিহীনভাবে চলে তাহলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে মাত্র ৫৫ মিনিট সময় লাগবে।
যদিও এর জন্য একজন যাত্রীর ২ হাজার টাকার মতো ভাড়া গুণতে হবে, যা বাংলাদেশে চলমান আন্তঃনগর রেলের এসি চেয়ারের ভাড়ার তিনগুণ।
এই রেলটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলবে এবং প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে।
ইতোমধ্যে, বাংলাদেশ রেলওয়ে উচ্চগতির এই রেল সেবার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছে। এজন্য সম্ভাব্য রুটও নির্বাচন করা হয়েছে এবং প্রায় ৯৭ হাজার কোটি টাকার এই রেল প্রকল্পের নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে।
তবে, এই অর্থের উৎস নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
জানা গিয়েছে, উচ্চগতির রেল পথটি আগের রেলপথের চেয়ে প্রায় ৯০ কিলোমিটার কম হবে।
এদিকে, দুইজন পরিবহন বিশেষজ্ঞ প্রকল্পটিকে ‘উচ্চাভিলাষী’ আখ্যা দিয়েছেন। যেখানে বাংলাদেশ রেলওয়ে এখনও বৈদ্যুতিক রেল সেবা শুরু করতে পারেনি, সেখানে উচ্চ গতির রেল পরিচালনার সক্ষমতা আছে কী না তা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
এই প্রকল্পের পরিচালক মো. কামরুল আহসান বলেন, “এ বছরের এপ্রিলের মধ্যে প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হবে।”
গত ২৪ ডিসেম্বর দ্য ডেইল স্টারকে তিনি বলেন, “তখন আমরা এই প্রকল্পের জন্য একটি ডিপিপি (প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব) প্রস্তুত করবো। সেই সঙ্গে তহবিল সংগ্রহের কাজও করবো।” তিনি আশা করেন যে ২০২০ সালের মধ্যেই জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে।
কামরুল আহসান জানান, এই রেলের জন্য যাত্রীদের কিলোমিটার প্রতি ১০ টাকা ভাড়া ধার্যের কথা বলেছেন পরামর্শকরা। সেই অনুযায়ী ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে একজন যাত্রীর প্রায় ২ হাজার টাকা ভাড়া লাগবে।
“তবে, এ নিয়ে আরও বিশ্লেষণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে,” যোগ করেন তিনি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৩৪৫ টাকা এবং এসি চেয়ারের ভাড়া ৬৫৬ টাকা। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম ফ্লাইটের ভাড়া ২৫০০-৩০০০ টাকার মধ্যে।
কামরুল বলেন, প্রস্তাবিত রেলপথে মোট ছয়টি স্টেশন রয়েছে। সেগুলো হলো: ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, পাহাড়তলি এবং চট্টগ্রাম।
তিনি আরও বলেন, শুরুতে ৪০ জোড়া রেল চালু করা হবে। পরে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী রেলের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।
এর আগে, ২০১৭ সালের মার্চে পরিকল্পনামন্ত্রী “ঢাকা-চট্টগ্রাম হয়ে কুমিল্লা/লাকসাম উচ্চ-গতির রেল পথের সম্ভাব্যতা এবং বিশদ নকশার পরিকল্পনা” প্রকল্পের অনুমোদন দেন।
চায়না রেলওয়ে ডিজাইন কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশের মজুমদার এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে এ সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজটি করেন। বর্তমানে এর বিশদ নকশা তৈরির কাজ চলছে। যার জন্য ব্যয় হবে ১১০ কোটি টাকার বেশি।
ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২২৭ দশমিক ৩ কিলোমিটারের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ফেনী-চট্টগ্রাম রেল রুটের অনুমোদন দিয়েছেন।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের এই প্রকল্পটির জন্য মোট আনুমানিক ব্যয় হবে প্রায় ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ৯৬ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির জন্য ৬৬৮ দশমিক ২৪ হেক্টর জমির প্রয়োজন হবে, ফলে এটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ রেলওয়েকে ৪৬৪ দশমিক ২ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।
গত বছরের মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথটি সম্প্রসারিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
বাংলাদেশ রেলের কর্মকর্তারা জানান, যদি প্রকল্পটি কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পকে ছাড়িয়ে এটিই হবে সরকারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল একক প্রকল্প।
উচ্চ-গতির রেলপথ হবে উন্নত এবং ডাবল-ট্র্যাকের। এছাড়াও, পাথর-হীন এই রেলপথটি বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রথম বিদ্যুৎচালিত রেলপথ হবে।
“আমরা এখন বর্ধিত পথের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ডিপিপি তৈরি করছি,” বলেছেন কামরুল আহসান।
বর্তমানে, বাংলাদেশ রেলওয়ে সারাদেশে ৩ হাজার কিলোমিটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে ৩৬০টি যাত্রীবাহী রেল পরিচালনা করছে।
তবে, যাত্রীর সংখ্যা বাড়লেও প্রতি বছর মোটা অঙ্কের লোকসান গুনছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডেইলী স্টার